Saturday, January 3, 2015

দেশ কেন মা হবে?

দেহ 
নবজাতক শিশুর ওজন কতইবা থাকে, ৬/৭ পাউন্ড? কেজিতে কনভার্ট করে নিলে প্রায় ৩ কেজির মত। এই শিশুটিই কালের পরিক্রমায় বড় হয়ে উঠে, পূর্ণবয়সে ধরে নিলাম ৬০/৭০ কেজি হয়ে উঠেন। জীবন শুধুমাত্র প্রাণরসায়ন কিনা সে তর্কে যাব না। কিন্তু এই যে ৩ কেজি ভরের একটি শিশুর ৭০ কেজি ভরের হয়ে উঠা, ভরের এই সংযোজন কিন্তু পুরোটাই প্রাণ রসায়ন। একটা শিশুর প্রতিটি নতুন কোষ, হাড়, নখ চুল সবি তৈরি হচ্ছে তার খাবার, পানীয় ও বাতাসের অক্সিজেন থেকে। এমন করে ভেবে দেখেছেন কি, আপনার প্রতি কোষে যেই শর্করা তাই চাষ হচ্ছে কোন খেটে খাওয়া কৃষকের ক্ষেতের ধানে, আমিষ আসছে কোন গরিব দুঃখী জেলের জাল থেকে, ডিমগুলো কোন নতুন দম্পতির ডিমপাড়া একমাত্র মুরগি থেকে? দেহের প্রতি কোষে যেই পানি আপনার জীবন সংহার করে চলেছে তাও এই জমিনের, প্রতিটি DNA সুতোর ভাঁজে ভাঁজে যেই অক্সিজেন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস, সালফার প্রায় সবি আসছে বাংলাদেশের প্রকৃতি থেকে। শিশু আপনি বড় হয়ে উঠেছেন দেশের মৌলিক কণিকায়।

নিষিক্ত ডিম্বাণুর প্রথম কোষ যেই মাতৃজঠরে তিলে তিলে বড় হয়ে উঠি, ১০ মাস ১০ দিন যার দেহের পুষ্টি- উষ্ণতায় বেঁচে থাকি, যার বুকের দুধে দিনে দিনে বেড়ে উঠি তিনি যদি হন মা; তবে, যার ফল-ফসলে, জল-বাতাসে ছোট্ট শিশুটি একদিন বিশাল মানুষে পূর্ণ হয়, সেও তো মা!   

প্রাণ
দৈহিক ভরের বাইরে যে অনুভূতির আপনি, তার গঠন, কার্যকরণ নিয়েও ভেবেছিলাম কিছুটা। বিজ্ঞান একেও হরমোন নামে প্রাণরসায়নের মারপ্যাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা দিতে চাইলেও তার ব্যাখ্যা এখনো বড় অসম্পূর্ণ রয়ে গ্যাছে আমার কাছে। ইমন জুবায়ের ভাইয়ের একটা কথা ব্লগে সবার মনে ধরেছিলো ''জীবন মানে কেবলি যদি প্রাণরসায়ন, জোস্না রাতে মুগ্ধ কেনো আমার নয়ন?'' আলোচনার খাতিরে যদি ধরেও নেই তা প্রাণ রসায়ন, তারপরেও প্রশ্ন থাকে; আমরা বাংলাদেশিরা চাঁদকে, জোস্নাকে যেমন করে উপভোগ করি, অন্য দেশে অন্য সমাজে একি চাঁদের আবেদন মাত্রায় ভিন্ন, কেন?

সুন্দর আরেক উদাহরণ হলো বৃষ্টি। চারিদিকে যখন তপ্ত সূর্যের রুদ্র প্রতাপে জীবন দিশেহারা, বৃষ্টি তখন আমাদের বাংলার জীবনে প্রশান্তির বরমাল্য। বর্ষণ আমাদের ভালোবাসার প্রকাশ, গানে, প্রাণে! নারীর খোপায় বর্ষার ফুল, কবির পংতিতে বর্ষা, গায়কের দরাজ কণ্ঠে, সুরের ছন্দে বর্ষা! একি বৃষ্টি শীতের দেশে মোটেও শান্তির না; বৃষ্টি- বাদলার দিন মানে এখানে, It's a shit day! 
একি বৃষ্টিকে আমরা কিভাবে মনে গেথে নিচ্ছি তাও গড়ে উঠছে আমাদের দেশের আবহাওয়া থেকে।

আমাদের গান, উৎসব, লৌকিকতা মিশে আছে আমাদের প্রতি ঋতু, আবহাওয়া ও প্রকৃতিতে। আমাদের গল্প, কথা, সাহিত্য, মানব- মানবীর যত তুলনা উঠে আসে আমাদের নদী, ঝিল, পুকুর থেকে, পদ্ম শালুক, বালিকার সাতার হয়ে। ব্যাক্তি আপনি ও সামাজিক আপনি দুটোতেই মিশে আছে দেশের প্রকৃতি। প্রাণের যত অনুভূতি তাও গড়েছে যার ছাঁচে, সেও তো মা! 

শিক্ষা 
আমার চারপাশের যে মানুষগুলো, সবাই অনন্য! আমি ভালবাসি, কারো হাসি, কারো ঢং, ভালবাসি কারো চোখের জল। জীবন পথে সাথে পাওয়া সহযাত্রী, সহপাঠী যারা, তাদের অবদান আর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার উপাদানে সমৃদ্ধ আমার আজিকার জীবন। কারো কাছে শিখেছি হাত বাড়ানো, কারো কাছে ভাব নেয়া, কারো কাছে শিখেছি হৃদয়ের উষ্ণতা, কারো কাছে শীতলতা। জীবের কোষে কোষে তথ্যের প্রবাহ চলে যেমন দেহের স্নায়ুবিক তরঙ্গ হয়ে, আমাদের জনে জনে পারস্পরিক বোঝাপড়াও তো তেমনি একি দেহের স্নায়ুবিক তরঙ্গ হয়ে উঠার কথা। এই পারস্পরিক বোঝাপড়া, শিখে উঠার প্রক্রিয়ার যতটুকু সফলতা, তার যতটুকু ব্যর্থতা তাও এসেছে আমার চারপাশ থেকে।

শিশুর অস্ফুট মুখে বুলি ফুটিয়ে তোলেন যদি মা, তবে হৃদয়ের বুলি, মগজের ভাষা গড়ে দেয় যে পারিপার্শ্ব সেও তো আরেক মা।   




বি দ্রঃ আপনি জানেন হয়তো, আপনার দেহের রং, শরীরের গঠন, উচ্চতা সবকিছুতেই মিশে আছে আপনার খাদ্যাভ্যাস ও বিশ্ব মানচিত্রে আপনার দেশের অবস্থানের উপর। আমাদের জিনোটাইপ ও ফিনোটাইপ বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক লেখা পাওয়া যাবে।   

No comments: