Saturday, January 3, 2015

ক্যাফে ম্যাঙ্গো ও নীল অপরাজিতা

ধানমণ্ডি ৫ এর মাথায় ক্যাফে ম্যাঙ্গো, বেশ গোছানো একটা ক্যাফে-রেস্তোরাঁ। পুরনো একটা বাড়িকে সাজগোঁজ করে নতুনরুপ দেয়া। রাস্তা থেকে ভেতরে ঢুকতে ছোট্ট যেই গলি তার দুধারে সবুজ, টবে লাগানো হরেকরকম গাছ-গাছালি আর দরজার গা ঘেঁষে দেয়ালে ঝুলে আছে লতাপাতা; ম্যানিপ্লান্ট হবে অথবা অন্যকিছু, মনে নেই। অবশ্য ভালোলাগাটুকুকে মনে গেথে দিলো ক’টি নীল অপরাজিতা; মৃদুমন্দ শ্রাবণের বাতাসে মাথা টোকাটুকি করে দুলছে, অনেকটা লজ্জাবনত ষোড়শী কিশোরীর মত, সপ্রভিত একটা টান টান সতেজতা অথচ লাজুক,  ডানে বায়ে দুলছে। আমি বসে আছি ঢোকার পরের প্রথম ঘরটায়, চারিদিকে অর্ধস্বচ্ছ কাচে ঘেরা, কিছুটা জায়গায় চিকন বাশের ব্লাইন্ডস দেয়া। যখন ঢুকে বসেছি তখনো বাইরে সূর্য ছিল, মেঘও ছিল। ব্লাইন্ডসের চিকন বাশগুলোর ফাক গলে ঢুকে পড়ছে কিছু আলো, ঘরটার একদিক হালকা আলোময়, আমি বসে আছি ঢাউস সাইজের একটা কাচের টেবিলের পাশে পাতানো গদিতে। জায়গাটা সুন্দর, শৈল্পিক ঢংয়ে সাজানো গোছানো কিন্তু তাতে কি, আমার মন প্রাণতো কেড়ে নিলো ওই ছোট্ট অপরাজিতা, গাঢ় নীলের মধ্যে নিষ্কলংক ওর সাদা বৃত্তে আমি বন্দী,  বিমুগ্ধ হয়ে চেয়ে আছি। বাতাস বাড়ছে, মেঘের আড়ালে সূর্যও ঢাকা পড়লো, হালকা অন্ধকার অন্ধকার আবহটা ভালোই লাগছে। বাংলার বর্ষা বড়ই মোহণীয়, ধীরে ধীরে জমে উঠা আমাদের দুঃখ-জরা, ক্ষত-শোক, ক্রমাগত নষ্টামিতে ভরে উঠা ধুলোবালি, ওকি আপন মায়ায় ধুয়ে দেয় ঝিরিঝিরি জলের প্লাবনে। বেশ শব্দ করে বৃষ্টি হচ্ছে, কি অবিরাম সুরের ধারার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে নিত্যকার কষ্ট দেয়া চিৎকার চেঁচামেচি, হইচই। প্রথম যখন বৃষ্টি শুরু হল, শব্দ ছিল একরকম, একটা তেজদীপ্ত শাঁসালো স্বর; এখন একটু পাল্টে গ্যাছে, তুলনামূলক কোমল ধারায় ঝরছে, শব্দসুরে ভালোকরে মন পেতে আরো কিছু সুর ধরছি, বেজে চলছে আমার বৃষ্টি তানপুরায় টুপটুপ, টুং টাং। আর আমার ছোট অপরাজিতা? ওতো যেন বাধভাঙ্গা আনন্দে নেচেই চলছে, কোন এক প্রেমিকের ইশারায় বৃষ্টির সাথে জলকেলি খেলছে; হয়তবা আমাকেই ডাকছে, চির ব্যর্থ আমি বসেই আছি। তার সৌন্দর্যের মাদকতা, হেলেদুলে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ আমাকে তার কাছে আরো অযোগ্য করে তুলছে। আমি নড়তে পারছি না; দু কদম এগিয়ে, হাত বাড়িয়ে তাকে একটু ছোব, পারছি না! জীবনটা যেন আটকে আছে, ক্যাফে ম্যাংগোর এই বারান্দায়। জানালার গ্রিল গলে যতটুকু জল ছিটকে পড়ছে গায়, ওই সামান্যটুকুই যেন আমার প্রাপ্তি। শব্দ সুরে, আবছা আলোয় আমি ঘুমিয়ে যাচ্ছি হয়তো, ক্রমাগত ছিটকে আসা জলের কণাগুলো যেন আমাকে ঘুমুতে দেবে না, আমায় বারবার জাগিয়ে দিচ্ছে; আমি ঘুমুতেও চাই না, ছুয়ে ধরতে চাই ওকে, চেয়ে থাকতে চাই তার গাঢ় সাদা-নীলে। জেগে উঠেছি?! শুয়ে আছি ধবধবে সাদা সুতির চাদরে, উত্তরীয় আকাশে কত্ত বড় চাঁদ, বিশাল জানালার কাচ গলে ঢুকে পড়ছে ভর পূর্ণিমার সর্বনাশী আলো। আমি ক্রমাগত ভিজে যাচ্ছি, অবিরত জোছনা ও জলে, ভেসে যাচ্ছি স্বপ্ন-প্লাবনে!       

No comments: