মাত্র কদিন হলো দেশ থেকে ফিরলাম, হাতে ম্যালা কাজ।দৌড়াদৌড়ির জীবনে রান্নাবান্না না হয় ফাকিই দিলাম, কিন্তু জামাকাপড় ধোয়াতো বাদ চলে না। সপ্তাহান্তে যখন এই ভেজাইল্যা কাজখানা করবো বলে মনস্থির করলাম, এমন সময় সেকেন্ড সুপারভাইসর দরজায় হাজির। কয়, আমরা দিনকতক আগেই প্ল্যান করছিলাম, তুমি যেহেতু মাত্র আসলা তোমারে এখন কই শোন, চল আমরা এই ইউকএন্ড আমার সামার কটেজে কাটায়া আসি। পাগলারে সাকো নাড়াইতে আহবান করা হইসে, কিসের কি জামা কাপড়, গোল্লায় যাক, বান্দা রাজি! উনি আগেই তার সামার হাউজের গল্প করছিলেন, লেকের ধারে পাহাড়ি এলাকায় বাড়ি, আশে পাশের এলাকা পুরোটাই জঙ্গলে ভরা, প্রায় ১৬০ বছর আগে বানানো ২টা কাঠের ফ্রেমের ঘর, সাথে খোলামেলা বিশাল এক জায়গা।
যেখানে শব্দ মানে মৌমাছির ভো ভো গুঞ্জন
যেখানে শব্দ মানে মৌমাছির ভো ভো গুঞ্জন
গ্রুপের সঙ্গী-সাথি ৫ জন, প্রফেসর, তার স্ত্রী এবং আমরা তার ৩ শিষ্য। প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে বাক্স- পেটরা সমেত গাড়িতে রওয়ানা দিলাম, দুই তৃতীয়াংশ এসে কয় 'স্যেই গুডবাই টু ইয়্যুর ফ্রেন্ডস এন্ড ফ্যামিলি। ফর ইমারজেন্সি পারপাস গিভ দিস ল্যান্ডফোন নাম্বার টু দেম' মানে হইলো, আমরা খুব দ্রুত মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে যাচ্ছি। পুরাই ক্যারফা অবস্থা, মনে হইলো না কাউরে হঠাৎ ইমারজেন্সি একটা কন্টাক্ট নাম্বার ধরায়া দিয়া দুশ্চিন্তায় ফেলি (দুশ্চিন্তায় ফেলা যায় এমন কাউকে খুজেও পেলাম না) ... মনে মনে গুডবাই বলে অরণ্যআঞ্চলে প্রবেশ করলাম। বনের মধ্যে দিয়ে আকাবাকা পাহাড়ি পথ, পড়ন্ত বিকালের সূর্য সারি সারি গাছের ফাকে আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে চলল। পথের দু'ধারে অনেক লেক পড়লো, আমাদের গন্তব্য এমনি ছোট্ট একটা লেক Bisen এর তীরের একটা ঘর
আঁকাবাঁকা পাহাড়ি বনপথ
ঘণ্টা তিনেকের ড্রাইভ শেষে যখন পৌঁছলাম বেলা তখনো কিছু বাকি। ঝটপট গ্রীলে কিছু মেরিনেটেড চিকেন চড়িয়ে দিয়ে শুরু হলো কৌতূহল পূরণের প্রথম পর্ব। খুব যত্ন নিয়ে আমাদের বুঝালেন ১৬০ বছর আগে কিভাবে এই বাড়িটা তৈরি করা হইছিলো, কাঠ ব্যবহার করে তাপ কুপরিবাহক দেয়াল কিভাবে হলো, ওরা কিভাবে এতদিন ধরে বাড়িটার অরিজিনাল্যিটি ধরে রেখেছে ইত্যাদি ইত্যাদি। কয়েকটা বাতি, ১ টা পানির পাম্প ও একটা ১২ ভোল্টের রেফ্রিজারেটর চলে সোলার প্যানেলার বিদ্যুতে। বন থেকে সংগ্রহ করা কাঠে জ্বালালাম ঘরের হিটার। লেক থেকে পাম্পে তোলা পানিতে চলবে ঘরকন্নার কার্যাদি। সবাইকে থাকার জায়গা বুঝিয়ে দিয়ে নিয়ে গেলো তাদের গ্রীন টয়লেটে; কিভাবে গ্রীন হলো তার সবটাই বুঝিয়ে দিলো, যাইহোক আমি সে প্যাচালে আর না যাই।
আকাশটা এরকমই নীল, ঘাসগুলো আরো সবুজ। দূরে আকাশের বুক চিরে দেখা যাচ্ছে সভ্যতার নগ্ন ছোঁয়া, অ্যারোপ্লেনের সাদা ধোঁয়া।
সূর্যাস্তের আলোয় বসে হলো ডিনার।
ইয়াম্মি ইয়াম্মি চিকেন :)
ইয়াম্মি ইয়াম্মি চিকেন :)
সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁ পোকা মিস করলাম খুব, কিন্তু ওর বদলে পেলাম অন্য কিছু পোকার শব্দ। মুগ্ধ শ্রোতা হয়ে শুনছিলাম নানান পাখির ডাক, যদিও শেষ পর্যন্ত বাচ্চা মশারা বেশিক্ষন বাইরে বসতে দিলো না। কৃষ্ণপক্ষের দ্বিতীয় রজনী, আকাশ জুড়ে প্রায় পূর্ণিমার বান ডাকলো, শক্তিমান কিছু তারা জেগে রইলো তার পাশাপাশি। রাত্রির গভীরতার সাথে সাথে বাতাসে জমে উঠলো কুয়াশার আবছায়া, তাতে রাত্রি তার সৌন্দর্য এতটুকুও হারালো না; বরং জোছনার আলো ক্রমশ মোহনীয় হয়ে উঠলো তাতে। জমাট আড্ডায় মন চাইছিলো কেউ যদি গাইতো ' নিশি ভোর হলো জাগিয়া, পরানো পিয়া...'
পরদিন ছিলো বৈচিত্র্যময় একটা দিন। সকালে বেরুলাম মাছ শিকারে, নৌকায় কয়েকবার জায়গা বদল করেও খুব লাভ হল না :( একটা ছোট মাছ ধরা পরলো, কিন্তু আমার সাথের সুইডিশ কলিগ লিনাস বলল এতো ছোট একটা মাছ দিয়ে আমাদের কি হবে? মাছটা ছেড়ে দিয়ে মৎস্যপর্ব ইস্তফা দিলাম।
ব্যর্থ মৎস্যশিকারে যাত্রা
বন বাদাড়ে কুঁড়িয়ে খেলাম ফল, থেমে থেমে চললো ফুলের ছবি তোলা।
ব্যর্থ মৎস্যশিকারে যাত্রা
বন বাদাড়ে কুঁড়িয়ে খেলাম ফল, থেমে থেমে চললো ফুলের ছবি তোলা।
লাঞ্চ শেষ এবার একেক জনের প্ল্যান ভিন্ন হলো। একজন শুরু করলো ঘাস কাটা, একজন সূর্যস্নান, একজন বই পড়া। আমি নিলাম দৌড়ানোর পথ, লেকের পাড় ধরে ৪ কি মি হাটাপথ, একজনের পূর্ববর্তী রেকর্ড ছিলো ১৯ মিনিটের; আমাকেও জোর করে সেটা ভাঙ্গার দায়িত্ব দেয়া হলো! সময় যায় ৪ কি মি তো শেষ হয় না, অতঃপর ২৫ মিনিটে জায়গামত পৌঁছে মান ইজ্জত কিছুটা বাঁচালাম। অগাস্টের ৩য় সপ্তাহে এসেও দিনের বেলা ভালোই গরম ছিলো, স্বচ্ছ লেকের পানিতে আমরা সাতার কাটলাম। পানিতে ছোট ছোট মাছ দেখা যাচ্ছিলো।
আজকের ডিনারের মেইন কুক আমি, মেন্যু গরু বিরিয়ানী। জিজ্ঞেস করলাম স্পাইসি চাও না মাইল্ড? সবাই একযোগে চাইলো স্পাইসি হোক :) রান্নার বিভিন্ন পর্যায়ে চললো প্রশিক্ষণ ও স্বাদগ্রহণ। এপিটাইজার তৈরি করলো প্রফেসর, বন থেকে কুঁড়িয়ে আনা মাশরুম দিয়ে।
বন থেকে তুলে আনা মাশরুম
বন থেকে তুলে আনা মাশরুম
শেষমেশ awesome একটা ডিনার হলো, সবাই খুব প্রশংসা করলো। ডিনার শেষ মাছ ধরার আরেকটা প্রচেষ্টা চললো, এবার আমি গেলাম না। অন্ধকারে পাড়ে বসে নৌকার মানুষের সাথে গল্প করছিলাম, অনেক জোরে চেচিয়ে আমরা কথা বলছিলাম। এখানে কিছু বলার কেউ নেই, বিরক্ত হবার কেউ নেই, মানা করার কেউ নেই; মনে হচ্ছিলো গলা ছেড়ে কোন জেলেকে যেন বলছি 'ওহে জেলে ভাই, কয়টা মাছ পড়লো জালে?' রাতের শেষ পর্বে ছিলো সবাই মিলে ম্যুভি দেখা, জেমস বন্ডের বেশ পুরনো একটা ম্যুভি
You Only Live Twice ।
সকালের নাশতা শেষে সবাই মিলে গুছগাছ শুরু হলো, সবকিছু আগের মতো পরিপাটি সাজিয়ে রওয়ানা দিলাম চিরচেনা উপসালার পথে। পথে একটা পরিত্যাক্ত সিলভার মাইনের এলাকায় গেলাম, পথিমধ্যে আরো কতক আয়রন মাইন ও আয়রন প্রসেসিং ইন্ডাস্ট্রি পার হয়ে এলাম। ফিরে এলাম মানব রচিত কোলাহলের ভিড়ে।
জানি, যখন শহরতলীর কোলাহলে ক্লান্ত হয়ে উঠবে মন, নির্জনতায় এই ভ্রমণটাকে মিস করবো খুব।
No comments:
Post a Comment