Saturday, January 3, 2015

বাংলা নববর্ষ ১৪২০, জাগ্রত হোক আবহমান বাংলার শুভ বোধ!

রোম যখন পুড়ছিল নিরো তখন বাশি বাজাচ্ছিলো। নিরো হয়ত বেশ আত্নভোলা সুখেই ছিলো, নিজের শহর যখন পুড়ে যাচ্ছে, সে তখন বাশি বাজাতে পারলো, মাঝেমাঝে আমারও খুব আত্নভোলা হয়ে উঠতে ইচ্ছে করে, স্বার্থপরের মত আমিও বাশি বাজাতে চাই। ভাবি একটু- আধটু কবিতা লিখবো, ট্যুর থেকে তোলা কিছু ছবি আপ করবো, হয় না, হচ্ছেনা। দেশে যেই ভয়াবহ অবস্থা! পত্রিকা, টেলিভিশন আর আটপৌরে সঙ্গী ফেসবুক যেখানেই তাকাই না কেনো, ক্লান্ত ক্লান্ত ক্লান্ত, সর্বাংশে ক্লান্ত হয়ে উঠছি। ৫০০০ মাইলদূরে বসে যখন খুব ক্লান্ত ও বিরক্তি লাগে, তখন আবার দেশের ভেতরে থাকা মানুষগুলোর কথা চিন্তা শুরু করি; নিজের খারাপ লাগা নাই হয়ে যায়। ভাবি দেশের বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের জীবন আজ চরম উৎকণ্ঠা ও অস্থিরতায় যাচ্ছে, সেখানে আমিতো শতগুনে নিরাপদে আছি।

নববর্ষের একদিন বাকি। আর একটা দিন ওরাত্রি পার হলেই নতুন বছর; হাজার বছরের বাঙালি চেতনা, সংস্কৃতির ও মানুষের গণউৎসব।আমরা উৎসব প্রিয় জাতি, ভিন্ন মত ধর্মের উরধে উঠে আমরা আমাদের সমাজ গড়ে তুলেছি।আমরা হিন্দুর পার্বণেও গিয়েছি, মুসলমানের ঈদেও উৎসব করেছি, পাহাড়িদের বৈসাবি চলছে। আমরা রমজানে হিন্দুদের পূজো দেখেছি, মুসলমানদের নামাজে-আজানে হিন্দুদের পূজোর অনুষ্ঠানে নিরবতা দেখেছি। নববর্ষ উৎসব যেন আমাদের সকলের মহামিলনমেলা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের সোনালী দিনগুলো মনেপরলেই ফিরে আসে সবাই মিলে রমনায় ঘুরে বেরানো, হাজারো মানুষের ভীড় ঠেলে বন্ধুদেরখুজে চলার কথা।  পুরাতন বছরের ব্যর্থতা গ্ল্যানি অগ্নিস্নানে পুড়ে প্রতিবছর এই দিনে আমরা নতুনের প্রত্যয় ধারণ করেছি। এবার কি আমরা পারবো?   


কয়টা দিন আগেও আমাদের দেশটা ভালোইতো শান্তিতে ছিল। শত সীমাবদ্ধতা, সম্পদের অপ্রতিকূলতা, ব্যর্থ নেতৃত্ব সত্ত্বেও আমরাতো ধীরে হলেও এগিয়ে যাচ্ছিলাম। পৃথিবীর বহু মানুষের কাছে বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বয় তৈরি করেছিলো। আমরা এমনি জাতি, আমরা পরিশ্রমী, খেটে খাওয়া। ধনী বিশ্বের কিছু মানুষ যখন এত এত প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও কোথায় যেন কি শুন্যতায় ভোগে, আমার দেশের মানুষগুলোর তখন তার চেয়ে ৩০ ভাগের এক ভাগ উপার্জন করে কিভাবে যেন জীবনের পরিপূর্ণতা খুজে পায়। এতো দরিদ্র একটি দেশ হয়েও যখন আমরা সুখী দেশের তালিকার নিজেদের খুজে পাই, যখন দেশ সামাজিক উন্নয়নের সূচকে আমাদের থেকে তুলনামূলক বেশি ধনীদের পিছনে ফেলে দেয়, খুব আশান্বিত হই, কোথায় যেন এক তীব্র ভালোলাগা জেগে উঠে। নিজের সহোদরদের ভালবাসার কথা আমাদের যেমন কাউকে শিখিয়ে দিতে হয়না, আপনা আপনি সহজাত বোধ থেকে জেগে উঠে, তেমনি এদেশের মানুষ একে অপরকে চেতনে-অবচেতনে জড়িয়ে নিয়েছে কালে কালে।


পৃথিবীর বিভিন্ন দেশসহ ভারতবর্ষের অন্যান্য জায়গার দিকে তাকালেই যত প্রাসাদ, কেল্লা, দুর্গ আপনি দেখতে পাবেন, আমাদের বাংলায় এগুলো সংখ্যায় অনেক কম। আমি অনেক ভেবেছি, কেন? কেন আমাদের যুদ্ধের দুর্গ এতো কম? কেন ব্যবসায়ীবেশী ব্রিটিশরা এতোদূর থেকে এসে অল্পস্বল্প শক্তিতেই আমাদের কে পরাধীন করে দিলো, অতি সহজেই কেনো আমরা ২০০ বছরের গোলাম হয়ে রইলাম? কেনো আমরা অন্য জাতিকে কোনদিন দখল করতে গেলাম না? কেন আমরা নিজেদের নিয়েই যথেষ্ট ছিলাম? এতো চিন্তার মূলে আমি বাঙলায় প্রান্তিক শ্রেণীর সংখ্যাধিক্যকেই খুজে পাই। আদি থেকেই আমরা ছিলাম প্রান্তিক, প্রান্তিকের অল্পতেই তুষ্টি। দুবেলা খাবার, একটা ভালো ফসল, তাই যেন ছিল কৃষিভিত্তিক সমাজের যথেষ্ট পাওয়া। আমরা অল্পতেই তুষ্ট হয়ে উঠার মহোঔষধ খুজে নিজেছিলাম। আমাদের রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রণোদনা যখন মানুষকে জীবনের পথে পথে আটকে দেয়, আমরা রক্তদান করি, শীতার্তদের জন্য বস্ত্র জোগাই, আমরা অক্ষমের চিকিৎসায় সম্মিলিত হাত বাড়াই,আমাদের চিকিৎসকরা অল্প উপার্জনে মানুষের সেবা করে যায়, আমাদের লেখকেরা নামকাওয়াস্তে পারিশ্রমিকে কলম ধরে। এতোক্ষণে আমি যাদের কথা বললাম, এশুধু শোষিত বাঙালির গল্প; এ গল্পে কিন্তু সবাই ছিল; হিন্দু ছিল, মুসলমান ছিল, বৌদ্ধ ছিল, খ্রিষ্টানছিল, বাংলাদেশ পরবর্তীতে পাহাড়িরা ছিল, মোটের উপর সবাই, কিন্তু একজন ছিল না, শুধুএকজন। তার গল্প ভিন্ন, এবার একটু তার গল্পও বলি।


সে হল শোষক। আপনারা যারা জোক গল্পটিপড়েছিলেন এটি সেই জোক। সে আমাদের সমাজেরি অংশ, ধূর্ত ও কার্যকরী। সুযোগ বুঝে যারা রক্ত শুষে নেবে, অন্যাস্থাটাইজড শোষিত সমাজ সহজেই তার টেরও পাবে না। আরেকটু ডিটেইলস বলি, প্রাচীন বাংলায় তারা জোতদার ছিল, মহাজনী ছিল, পরে এরাই জমিদার হয়েছে, খেটে খাওয়া প্রান্তিকের রক্ত এরাই শুষেছে। রাজনৈতিক ভাবে এদের আসলে একক কোন দলনাই। ধরেন যখন আওয়ামী ক্ষমতায় এরা আওয়ামী লীগ, যখন বিএনপি ক্ষমতায় তখন তারা বিএনপি, যদি কোনদিন জামাত ক্ষমতায় আসে দরকারে তারা জামাতও করবে।  ৭১’এ কলকাতা বসে এরাই হালুয়া-লুচি খাইসে, যখন বঙ্গবন্ধুকে ৭৫ এ সপরিবারে হত্যা করা হয় তখন এরা সবাই পালাইসে মুখ দিয়া একটাওটু-শব্দ করে নাই, এরাই বিএনপি আমলে ফুলে ফেপে কলাগাছ হইছে, আজ যখন আওয়ামী হলুদ মিডিয়ার বিপরীতে ফাইট দেয়ার জন্য বিএনপি’র মিডিয়া সাপোর্ট দরকার হইয়া পড়ছে, মাহমুদুর রহমান বাদে সবগুলা ভাগছে। ৪৭এ যখন এদেশের হিন্দু ভারত গেছে, ভারতের মুসলমান এদেশে আসছে, দুই দেশেরই একই শোষক শ্রেণী সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করছে। অনেক সংখ্যালঘুকে অত্যাচার, হত্যা করছে। ৭১ এ এরাই আবার রক্ত পিপাসায় কাতর ছিল, হত্যা, ধর্ষণ, লুট কোনটাই ছাড়ে নাই। যুদ্ধপরবর্তী কালেও এরা ভালো তবিয়তেই ছিল, আরো আরো সংখ্যালঘুর বাড়িঘর, জমি- জেরাত এরাই খাইছে, খাওয়া এখনো থামে নাই, এখনো হিন্দু ভাইদের ভয়ভীতি দেয় এরা ‘জমি কিন্তু আমার কাছেই বেচতে হইবো’। তুলনামূলককম-শিক্ষিতগুলি গ্রামে গঞ্জে ছড়ায়া আছে, স্থানীয় পর্যায়েই শোষণ করে। কিন্তু যেইগুলা আরেকটু বেশি শিক্ষিত, দুই পাতার পুস্তক আর নকলের শিক্ষার সিঁড়ি বাইয়া এরা হুরহুর কৈরা উঁচা দালানে উইঠা পড়ছে।  এখন এদের কেউ কেউ গার্মেন্টস চালায়, পত্রিকা চালায়, নানান নামে ব্যাংক খোলে, অমুক টিভি, তমুক টিভি দিয়া বাংলা ভাসায়া ফেলছে, এরাই রেলওয়ের জায়গা দলিয়ো মানুষেরে দেয়, শেয়ার বাজার থিকা লাখো মানুষের টাকা নিজের পকেটে চালান করে।এরাই স্মাগ্লিং করে, এরাই ট্যাক্স ফাকি দেয়, কুইক রেন্টাল করে, খাম্বা বসায়, মজুতদার হয়, দেশপ্রেমিক সাইজা কয়লাকোম্পানির দালালি করে। এরাই দেশের গ্যাসে বিদেশীগো সোনার ডিমে তা দেয়। এরাই হলমার্ক করে, এরাই দেশের টাকায় বিদেশে ফুর্তি করে, নামে- বেনামে বিদেশে বাড়ি কেনে, এরাই ফি বছর ঢাকার শহরে লাফায়া লাফায়া বাসাভাড়া বাড়ায়, বাস ভাড়া বাড়ায়, ক্লিনিকে ক্লিনেকে চিকিৎসার নামে মানুষ জবাই করে। আমাদের নাকের সামনে মূলো ঝুলিয়ে এরাই পথে পথে আমাদের সংঘাতে নামায়, তলে তলে নিজেরা বেয়াই হয়।

 এই তো গেল পুরান প্রজন্ম, তাদের সবচেয়ে নতুন সংস্করণ গেলমান গুলা বেশ স্মার্ট। তেনারা পড়ালেখা দেশে করলেও বড় হইতে শুরু করছে নিজেগরে ওয়েস্টার্ন ভাইবা। ২ পাতা বাংলা লেখতে এগো হাওয়া বাইরায়া যায়, অথচ ইংলিশ ছিনেমা ডায়ালগসহ তাগো মুখস্ত থাকে। রেডিও জকি হইয়া ভাষারে ফ্যাশনের বস্তু বানায়া ফেলে, জারা- বোম্বাই ফ্যাশান হাউজে দামী পণ্যের ভোক্তা হয়, নিত্য নতুন গজানো সব বিলাসবহুল রেস্তোরায় শিশা টানে, ভাঙাচুরা রাস্তায় ধেই করে গাড়ি চালায়া রাস্তার মানুষেরে কাদা ছিটায়, এরাই গ্রামের পোলাপানরে ক্ষ্যাত আর মাদ্রাসার পোলাপাইনরে বুদ্ধিহীনমনে করে, এরাই থার্টি ফাস্টএ এখন দেশে হাজার টাকার পটকা ফুটায়, পশ্চিমা ধ্যান ধারণার উচ্ছিষ্টটুকু এরাই মোয়া মনে করে, বাঙাল দর্শনের অনেক কিছুরেই তারা মধ্যযুগিয়ো সাব্যস্ত করে।

  
আজ আমাদের অপরাধকে অপরাধ হিসেবে ভাবতে হবে, ব্যাক্তিকে তার অপরাপর পরিচয়ের (ধর্ম- বর্ণ- রাজনৈতিক) উরধে ঠেলে তার কৃতকর্মের দণ্ডে মাপতে হবে। শোষকের সাথে যদি আমরা যুদ্ধে নামি, শোষিতের অধিকার চাইতো, আমাদের আজ প্রথাগত এ শক্তির বিরুদ্ধে হাতে হাত রেখে দাড়াতে হবে, এ যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদের, এ যুদ্ধ রেনেসার, এ যুদ্ধ সমাজের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের। এ পরিবর্তন হবে আদর্শিক। বিভেদের সীমানা প্রাচীর তুলে আজ ওরা শুধু আমাদের দমিয়ে রাখতে চায়। তাদের ভাগ বাটোয়ারার যুদ্ধে আমাদের নীরবতাকে, আমাদের অদূরদর্শিতা, অ্যানেস্থাটাইজড বোধকে তারা নিজেদের গদি বাচাতে ব্যবহার করতে চায়। একদলকে ফ্যাসিবাদী চেতনায় হিপ্নোটাইজ করে ওরা আরেক দলকে কাবু করতে চায়। অতি দুঃখ ভারাক্রান্ত মন আজ। ধরে ধরে জবাই করার মন্ত্রে একদলকে ওরা উস্কে দিলো, পুলিশের গুলিতে ওরা মানুষ মেরে যে ঘাত দিল, স্বাভাবিক প্রতিফলনে আজ প্রতিঘাত হয়ে ফেরত দিচ্ছে আরেকদল। আজ আমরা ভালোবাসার শক্তিতে আস্থা হারিয়ে ফেলছি, ওদের হিংসার বিপ্লব ফাদে পা দিয়েছি। আজ যে যুদ্ধ হবার কথা ছিল আমাদের শ্রেণী বৈষম্যের বিরুদ্ধে, যে যুদ্ধ হবার কথা ছিল প্রকৃত গণতন্ত্রের, দারিদ্র মুক্তি ও স্বাধীনতার, তারা আমাদের সেখান থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। যারা কথায় কথায় বাংলা হয়ে যাবে আফগান, বাংলা হবে ভারত বলে মুখে ফেনা তোলে আমি আর তাতে সীমাবদ্ধ নই, জুজুর ভয় দেখিয়ে আর কত? আমি বুঝে গেছি বাংলা বাংলাই রবে। যে বাংলা আস্তিকের, সে বাংলা নাস্তিকেরও। অপরের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান আমাদেরি নিশ্চিত করতে হবে। যে বাংলা শোষকের, সে বাংলা শোষিতেরো। তারা এতদিন মঞ্চে উঠেছে, মুখের কাছে মাইক পেয়েছে, যে কোনদিন মঞ্চে উঠেনি, যে কোনদিন তার কথাগুলো বলতে পারেনি এবাংলা তারও। এ বাংলায় তারো অধিকার ওদের চাইতে কম নয়, আজ সবাইকে তার কথাও শুনতে হবে। আজ আমাদের শোষিত শ্রেণীকে নিজেদের কথা বলতে হবে, রাষ্ট্রে নিজেদের অংশ শোষকের হাত হতে ধীরে ধীরে ফিরে পেতে হবে। রাজনীতির মঞ্চ নষ্টদের হাতে নয়, সুস্থ বিবেকসম্পন্ন শিক্ষিত তরুণদেরই বুঝে নিতে হবে।   
    
বিপ্লব হোক সার্বজনীন, বিপ্লব হোক আদর্শিক, বিপ্লব হোক বুনিয়াদী, হোক দীর্ঘমেয়াদি, বিপ্লব হোক বাংলার আবহমান সমাজের! শুভ বুদ্ধির জয় হোক, ভালবাসার জয় হোক,  আগামির জীবন শুভ হোক! 

No comments: